পানির পিএইচ (pH)—মাছের আরাম আর মরণ
মন দিয়া শোনেন, এইটা হইলো মাছের ‘রক্তচাপ’ বা ‘মেজাজ’।
পানির পিএইচ (pH)—মাছের আরাম আর মরণ
শোনো ভাই, পিএইচ (pH) হইলো এমন এক মাপকাঠি যা দিয়া বোঝা যায় আপনার পুকুরের পানি কি ‘টক’ (Acidic) নাকি ‘তেতো/ক্ষার’ (Alkaline)। এর মাপ হইলো ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত।
-
৭ হইলো মাঝখান (নিউট্রাল): না টক, না তেতো।
-
৭-এর নিচে নামলে: পানি টক বা এসিডিক হইতে থাকে।
-
৭-এর ওপরে উঠলে: পানি ক্ষারীয় হইতে থাকে।
মাছের জন্য জান্নাত বা সবচাইতে আরামদায়ক জায়গা হইলো ৭.৫ থেকে ৮.৫। এই মাপে পানি থাকলে মাছ চনমনে থাকে, পাগলের মতো খাবার খায় আর হু হু করে বড় হয়।
১. পিএইচ (pH) কমে গেলে কী হয়? (টক পানি)
ধরেন টানা বৃষ্টি হইলো। বৃষ্টির পানি হইলো এসিডিক। এই বৃষ্টির পানি পুকুরে পড়লে পিএইচ হুট করে ৭-এর নিচে নাইমা যায়।
-
মাছের দশা: মাছের শরীরের ওপরের পিচ্ছিল আবরণ (Mucus) নষ্ট হইয়া যায়। মাছের চামড়ায় চুলকানি হয়, গায়ে লাল দাগ পড়ে, মাছ তখন পুকুরের কিনারে বা তলায় গিয়া ঘষাঘষি করে।
-
আপনার লস: এই অবস্থায় মাছ স্ট্রেসে থাকে, খাবার খায় না। দামী খাবারগুলা পইচা তলায় গ্যাস হয়।
-
সমাধান: পিএইচ কমলে সবচাইতে বড় ওষুধ হইলো চুন। প্রতি শতাংশে ২৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম পাথর চুন গুলে ঠান্ডা করে ছিটায়ে দিলে পিএইচ আবার বেড়ে ঠিক হয়া যায়।
২. পিএইচ (pH) বেড়ে গেলে কী হয়? (তেতো পানি)
রোদে যখন পুকুরে প্রচুর শ্যাওলা হয়, তখন বিকেলে মেপে দেখবেন পিএইচ ৯ বা ১০ পার হইয়া গেছে।
-
মাছের দশা: পানি যখন বেশি ক্ষারীয় হয়, তখন পুকুরের তলায় থাকা অ্যামোনিয়া গ্যাস ১০ গুণ বেশি বিষাক্ত হইয়া যায়। মাছের ফুলকা জ্বইলা যায়, মাছ নিশ্বাস নিতে পারে না।
-
সাবধান: এই অবস্থায় চুন দেওয়া মানে হইলো বিষ ঢালা। চুন দিলে পিএইচ আরও বাড়বে আর মাছ এক রাতেই শেষ হইয়া যাবে।
-
সমাধান: পিএইচ বাড়লে তেঁতুল পানি বা চিটাগুড় (Molasses) গুলে দিতে পারেন। আর সবচাইতে ভালো হইলো পুকুরের তলার কিছু পানি সরায়া নতুন ফ্রেশ পানি দেওয়া।
৩. সকাল-বিকালের জাদুকরী খেলা (Daily Change)
এইটা অনেক চাষী জানে না কাসেম ভাই। পুকুরের পিএইচ কিন্তু সারাদিন এক থাকে না।
-
ভোরে: পিএইচ সবচাইতে কম থাকে। কারণ রাতে গাছপালা কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়ে।
-
বিকেলে: পিএইচ সবচাইতে বেশি থাকে। কারণ শ্যাওলা রোদে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নেয়।
ওস্তাদের টিপস: আপনি যদি দুপুর ২টায় পিএইচ মেপে দেখেন ৯, তাইলে ভয় পাইয়েন না। আসল মাপ হইলো সকাল ৭টা থেকে ৮টা। সকালে যদি পিএইচ ৭.৫ এর আশেপাশে থাকে, তাইলে বুঝবেন আপনার পুকুর একদম ফিট।
৪. বৃষ্টির দিনের সতর্কতা
টানা বৃষ্টির পর পুকুর পাড়ে গিয়া হাত-পা গুটায়ে বইসা থাইকেন না। বৃষ্টির পর পিএইচ কমবেই। বৃষ্টির পর পিএইচ মেপে যদি দেখেন কম, তবে সাথে সাথে চুন আর লবণ দিবেন। এইটা মাছের জন্য ‘স্যালাইন’ এর মতো কাজ করে।
৫. কেন ডিজিটাল মিটার দরকার?
পুরানো চাষীরা হাতের আঙুল চুবায়া দেখে পানি ঠান্ডা না গরম। ভাই, পিএইচ কি আর হাতে কামড় দেয়? পিএইচ বোঝার উপায় নাই যদি আপনার কাছে একটা ডিজিটাল পিএইচ মিটার না থাকে। বাজারে লিটমাস পেপার বা কাগজের কাঠি পাওয়া যায়, কিন্তু পুকুরের ঘোলা পানিতে ওই কাগজের রঙ বোঝা যায় না।
একটা ভালো ব্র্যান্ডের ডিজিটাল মিটার কিনলে আপনি একদম নির্ভুল মাপ পাবেন। অংক মিলায়া চাষ করলে লস আসার কোনো পথ নাই।
সারকথা মনে রাখেন:
১. মাছের জন্য আদর্শ পিএইচ: ৭.৫ – ৮.৫।
২. পিএইচ মাপার শ্রেষ্ঠ সময়: ভোরবেলা।
৩. কমলে দিবেন চুন, বাড়লে দিবেন নতুন পানি বা চিটাগুড়।
৪. বৃষ্টির পর পিএইচ চেক করা ফরজ।
বুঝতে পারলেন তো কাসেম ভাই? পিএইচ হইলো আপনার পুকুরের মেজাজ। মেজাজ ঠান্ডা তো ব্যবসা চাঙ্গা!
যাও এখন, কাল সকালে মিটারটা নিয়া পুকুরে যাইবা। মাপা শেষ কইরা আমারে জানাইবা রিডিং কত পাইলা। কোনো আলসেমি করবা না কিন্তু! চলো, এখন উঠি!
পানির পি এইচ মাপার কিট পেতে এখানে ক্লিক করুন
পানির পি এইচ মাপার মিটার পেতে এখানে ক্লিক করুন